মালখানা ব্যবস্থাপনায় হাইকোর্ট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা।
ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ন্যায়বিচারের জন্য জব্দকৃত আলামত, মালামাল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রীর সঠিক সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে Law Lab একটি সময়োপযোগী ও জনস্বার্থমূলক আইনি উদ্যোগ গ্রহণ করে।
গত ২৮ আগস্ট ২০২২ ইং তারিখে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের পাঁচজন আইনজীবী হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। Law Lab পিটিশনারদের পক্ষ থেকে রিটটি প্রস্তুত করে। পিটিশনে উল্লেখ করা হয় কিভাবে মালখানায় দামি গাড়ি, ট্রাক, বাস, সিএনজি অটোরিকশা, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ ট্রাক, রিকশা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন ও অন্যান্য সামগ্রী অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। যানবাহন ধুলাবালি ও ময়লায় ঢাকা পড়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রে যানবাহনের ওপর লতাগুল্ম ও গাছপালা জন্মেছে। কিছু যানবাহনের যন্ত্রাংশ হারিয়ে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে। পিটিশনাররা উক্ত রিট পিটিশনে প্রার্থনা করেন যে, বিভিন্ন থানার এসব মালখানায় অনিরাপদভাবে সংরক্ষিত জব্দকৃত সামগ্রী, দ্রব্য ও আলামতের যথাযথ সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির জন্য মাননীয় আদালত যেনো যথোপযুক্ত নির্দেশনা প্রদান করেন।
গত ৩০ আগস্ট ২০২২ ইং তারিখে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ এই বিষয়ে রুল জারি করেন। একইসঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপিকে থানার মালখানায় সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও যানবাহনের সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা প্রদান করেন।
পরবর্তীতে পুলিশ ৬ জুলাই ২০২৩ ইং তারিখে তাদের প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন।
রিট পিটিশনটি পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্য জনাব বিচারপতি মোঃ হাবিবুল গনি ও জনাব বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসাইনের দ্বৈত বেঞ্চে তালিকাভুক্ত হয়।
অবশেষে ৮ জুলাই ২০২৬ ইং তারিখে মাননীয় আদালত উভয়পক্ষের শুনানি শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী নির্দেশনা প্রদান করেন।
পিটিশনারদের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন Law Lab-এর হেড অব চেম্বারস, জনাব মোহাম্মদ শিশির মনির, সিনিয়র অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট এবং তাঁকে সহযোগিতা করেন যায়েদ বিন আমজাদ, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।
সরকারের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মালখানা-সংক্রান্ত সমস্যার বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধানের প্রস্তাব দেন। এ লক্ষ্যে তিনি একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন।
মাননীয় আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
আদালত মালখানা ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশনা প্রদান করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ১৭ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটি গঠন করতে বলেন। এই কমিটির সদস্য হবেন-
১. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের মনোনীত যুগ্ম সচিবের নিম্ন পদের নহে এমন একজন সদস্য,
২. পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সেক্রেটারি মনোনীত যুগ্ম সচিবের নিম্ন পদের নহে এমন একজন সদস্য,
৩. পুলিশের আইজিপি মনোনীত এসিস্টেন্ট কমিশনার পদের নিম্ন নহে এমন একজন পুলিশ সদস্য,
৪. পুলিশের আইজিপি মনোনীত ইন্সপেক্টর পদের নিম্ন নহে এমন একজন পুলিশ সদস্য, যিনি ফরেনসিক বিজ্ঞানে অভিজ্ঞ হবেন,
৫. আইন বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের মনোনীত যুগ্ম জেলা জজের নিম্ন পদের নহে এমন একজন নিম্ন আদালতের বিচারক,
৬. বাংলাদেশ ব্যাংকের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার মনোনীত একজন প্রতিনিধি,
৭. তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় মনোনীত একজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ,
৮. বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মনোনীত সুপ্রীম কোর্ট প্রশাসনের একজন সদস্য,
৯. অ্যাটর্নি জেনারেলের মনোনীত দুজন প্রতিনিধি,
১০. বাদীপক্ষের আইনজীবী জনাব মোহাম্মদ শিশির মনির অথবা তার মনোনীত একজন প্রতিনিধি,
১১. অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনোনীত অর্থ মন্ত্রনালয়ের মনোনীত একজন সদস্য,
১২. ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালতের একজন বিজ্ঞ পাবলিক প্রসিকিউটর,
১৩. মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনোনীত একজন সদস্য,
১৪. বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক মনোনীত বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের একজন সদস্য,
১৫. বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মনোনীত একজন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের একজন সদস্য
১৬. জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোনীত শুল্ক অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধি।
আদালত কমিটিকে ২ মাসের মধ্যে মালখানা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের কার্যকরী ও আধুনিক রূপরেখা সংবলিত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশনা প্রদান করেন।
এছাড়াও আদালত সুপ্রীম কোর্টের রেজিস্টার জেনারেলকে অধস্তন আদালতের বিচারকদের ফৌজদারী কার্যবিধির অধ্যায় XLIII, ক্রিমিনাল রুলস এন্ড অর্ডার এর অধ্যায় XII এর বিধান অনুসরণপূর্বক দ্রুততম সময়ে জব্দকৃত মালামাল মালিকের নিকট হস্তান্তরের নির্দেশনা প্রাদান সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশনা প্রদান করেন।
দেশের সকল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পুলিশ রেগুলেশন্স অব বেংগল এর বিধি ৩৭৯, ৫২৫ এবং ৫২৬ প্রতিপালনপূর্বক পুলিশ হেডকোয়ার্টারকে (আইজিপি) নিয়মিত তথ্য প্রদানের নির্দেশনা প্রদান করেন।